উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
বাড়িতে হামলা-লুটপাটের অভিযোগ, একে একে ৭ মামলা
ফেনীর ফাজিলপুর জিন্নাহ উচ্চবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আজিজুল হক এখন নিজের ভিটেমাটিতেই ফিরতে পারছেন না। প্রায় ৮০ বছর বয়সী এই প্রবীণ শিক্ষক ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ করেছেন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে একে একে করা হয়েছে সাতটি মামলা। ফলে একসময় নিজের হাতে গড়া বাড়িঘর ছেড়ে এখন এক মেয়ের বাড়ি থেকে আরেক মেয়ের বাড়িতে ঘুরে দিন কাটছে তাঁর।
সাপ্তাহিক সাদা কাগজ-এর হাতে আসা বিভিন্ন নথি ও তথ্য থেকে এসব ঘটনা জানা গেছে।
আজিজুল হকের পাঁচ মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। ফাজিলপুর জিন্নাহ উচ্চবিদ্যালয়ে ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রাইভেট পড়িয়ে কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় দিয়ে বাড়ির পাশে নয় শতাংশ জমি কেনেন। প্রধান সড়কের পাশে ওই জমিতে টিনের ঘর নির্মাণ করে তা ভাড়াও দেন।
আজিজুল হকের ভাষ্য, কয়েক বছর আগে জমিটি তিনি পাঁচ মেয়ের নামে লিখে দেন। এরপর থেকেই জমিটি নিয়ে তাঁর ওপর নানা ধরনের চাপ ও হুমকি আসতে থাকে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁকে বিভিন্নভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁকে ‘আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ’ আখ্যা দিয়ে তাঁর বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়।
আজিজুল হকের অভিযোগ, এ ঘটনায় নেতৃত্ব দেন তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে এ এস এম মঈনুল হোসেন (জ্যাকসন)।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের তিন দিনের মাথায়, ৮ আগস্ট সকালে আজিজুল হকের বাড়িতে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আজিজুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্যাকসনের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৩৫ জন বহিরাগত বাড়িটির চারপাশে অবস্থান নেন। তাঁরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। একপর্যায়ে প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ একটি টিনের ঘর ভেঙে ফেলা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জ্যাকসন, তাঁর ভাই নাজমুলসহ কয়েকজন আজিজুল হকের বসতঘরে ঢুকে পড়েন। তখন সেখানে ছিলেন তাঁর স্ত্রী শাহিন আরা বেগম, অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে মাহমুদা আকতার ও জামাতা মামুন। তাঁদের বেঁধে স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন আজিজুল হকের পরিবার। এ সময় মামুনের মাথায় আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুপুর পর্যন্ত সেখানে তাণ্ডব চলে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
হামলার সময় আজিজুল হক বাড়িতে ছিলেন না। চিকিৎসার জন্য তিনি চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করা হয়। ওই দিন এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়তে হয় তাঁদের।
পরদিন সকালে আমিনবাজার সেনা ক্যাম্পে দুই পক্ষকে ডাকা হয়। সেখানে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর জ্যাকসন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভর্ৎসনা করা হয় বলে আজিজুল হকের পরিবার জানিয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করে লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়।
আজিজুল হকের পরিবার বলছে, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এ পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা করা হয়েছে।
২০১৩ সালে প্রথম ফৌজদারি মামলা করেন জ্যাকসনের বাবা মর্তুজা ভূঁঞা। এরপর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট একই আইনে মামলা করেন জ্যাকসন। আজিজুল হকের পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি মামলাতেই তাঁদের পক্ষে রায় যায়নি। পরে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রিভিশন মামলা করা হয়। গত ৫ মার্চ আদালত সেটিও নামঞ্জুর করেন।
এরপর ১০ মার্চ জ্যাকসন, তাঁর মা ও দুই ভাই আজিজুল হক এবং তাঁর পাঁচ মেয়ের বিরুদ্ধে ফেনী সদর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে স্বত্ব ঘোষণার দাবিতে মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
পরদিন ১১ মার্চ ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আরেকটি মামলা করেন জ্যাকসনের মা নিলুফা আক্তার। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের দুটি মামলার মতো এই মামলাটিও পরে প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর ১৩ এপ্রিল আজিজুল হকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেন নিলুফা আক্তার। সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল একই আইনে মামলা করেন জ্যাকসনের ভাই নাজমুল হোসেন। মামলাটি বর্তমানে চলমান।
বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ফেনী মডেল থানায় অভিযোগ করেন আজিজুল হক। পরে ১৪ আগস্ট স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সেদিন সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপার পর উভয় পক্ষকে নিজ নিজ জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয় বলে আজিজুল হকের পরিবার জানিয়েছে। সালিশনামা মেনে নিয়ে জ্যাকসন তাতে স্বাক্ষরও করেন বলে দাবি তাঁদের।
তবে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি আজিজুল হক তাঁর সীমানাপ্রাচীর মেরামত করতে গেলে জ্যাকসনের লোকজন বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে তদন্ত শেষে বোগদাদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ আলী গত ১০ এপ্রিল যে প্রতিবেদন দেন, সেটিও আজিজুল হকের পক্ষে গেছে বলে তাঁর পরিবারের দাবি।
হামলা ও নির্যাতনের প্রতিকার চেয়ে আজিজুল হক ও তাঁর মেঝো মেয়ে মরিয়ম আকতারের করা দুটি মামলাও বর্তমানে চলমান রয়েছে।
হামলার পর থেকে আজিজুল হক আর নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এখন কখনো এক মেয়ের বাড়িতে, কখনো অন্য মেয়ের বাড়িতে থাকছেন।
৩৫ বছর যে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিক্ষিত করেছেন, জীবনের সঞ্চয় দিয়ে যে ভিটায় ঘর তুলেছেন—সেই বাড়িতেই এখন তাঁর প্রবেশ অনিশ্চিত।
নিজের ভিটায় ফিরে স্বাভাবিক জীবন কাটানোর সুযোগ চান তিনি। একই সঙ্গে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের বিচার এবং একের পর এক মামলার কারণে সৃষ্ট হয়রানি থেকে মুক্তি চান এই প্রবীণ শিক্ষক।