উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়া রেকর্ড সংখ্যক আসনে জয় পেয়েছে। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ৪৫০ সদস্যের স্টেট ডুমায় দলটি ৩৫৫টি আসন পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দলটির পার্লামেন্টারি প্রতিনিধিত্ব ২০১৬ সালের আগের সর্বোচ্চ ৩৪৩ আসনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত তিন দিন ভোটগ্রহণের পর সোমবার রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন প্রাথমিক ফল ঘোষণা করে। কমিশনের হিসাবে, ৯৫ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে ইউনাইটেড রাশিয়া ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি পেয়েছিল ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট।
নতুন ফলাফল অনুযায়ী, ডুমায় ইউনাইটেড রাশিয়ার আসনসংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে দলটি আগের সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও শক্তিশালী করেছে। রাশিয়ার সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ডুমায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন; ৩৫৫টি আসন নিয়ে ইউনাইটেড রাশিয়া সেই সীমার অনেক ওপরে রয়েছে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান এলা পামফিলোভা জানিয়েছেন, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৫৯ শতাংশের বেশি ছিল। কমিশন এটিকে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন।
এটি ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটির প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট পুতিন এর আগে নির্বাচনকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্য ও সরকারের প্রতি সমর্থনের একটি পরীক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
নির্বাচনের পর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ বলেন, ভোটের ফল রুশ সমাজে রাষ্ট্রপ্রধানের চারপাশে উচ্চমাত্রার সংহতির ইঙ্গিত দেয়। ক্রেমলিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফলাফল পুতিনের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রতিফলন।
প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ইউনাইটেড রাশিয়ার পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি, যারা ৪০টি আসন পেয়েছে। জাতীয়তাবাদী এলডিপিআর পেয়েছে ২৫টি এবং নিউ পিপল পেয়েছে ২০টি আসন। ‘এ জাস্ট রাশিয়া’ চারটি আসন পাওয়ার পথে রয়েছে বলে ইউরোনিউজ জানিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডুমায় প্রবেশ করা এসব দল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ইউনাইটেড রাশিয়ার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই একই অবস্থানে ভোট দিয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়গুলোর একটি ছিল বিরোধী ও যুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ। রাশিয়ার একমাত্র নিবন্ধিত যুদ্ধবিরোধী দল হিসেবে পরিচিত ইয়াবলোকো জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। তবে দলটির কিছু প্রার্থী আঞ্চলিক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, ইয়াবলোকো একটি আঞ্চলিক পার্লামেন্টে সামান্য প্রতিনিধিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনটি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে ক্রেমলিন ও ইউক্রেন যুদ্ধের সমালোচনাকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অনেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পায়নি। ইয়াবলোকোকে জাতীয় ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্স ও এপি—দুই সংস্থার প্রতিবেদনে নির্বাচনী পরিবেশকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিরোধী রাজনীতিকদের একটি অংশ কারাবন্দি বা নির্বাসিত অবস্থায় রয়েছেন এবং যুদ্ধের সমালোচনার ওপর রাশিয়ায় কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নিয়েও সীমাবদ্ধতা ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা এসেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের রুশ-অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে ভোট আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আপত্তি জানিয়েছে। এসব অঞ্চলে নির্বাচন আয়োজনকে তারা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখেছে।
অন্যদিকে রুশ কর্তৃপক্ষ নির্বাচনকে বৈধ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণকে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সফল হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নির্বাচনের শেষ দিনে ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালায়। মস্কো ও আশপাশের এলাকায়ও হামলার খবর পাওয়া যায়। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, হামলায় প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, নির্বাচনী অবকাঠামো সাইবার হামলার লক্ষ্য হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের প্রধান পামফিলোভা নির্বাচনের সময় একাধিক ডিডস হামলার কথা উল্লেখ করেন। তবে এসব হামলার পেছনে কারা ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
একই সময় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক নির্বাচনে চেচনিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা রমজান কাদিরভও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। সরকারি ফলাফলে তিনি প্রায় ৯৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের রুশ পার্লামেন্ট নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইউনাইটেড রাশিয়ার অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। ৩৫৫ আসনের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডুমায় আইন প্রণয়ন এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দলটির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। তবে একই সঙ্গে বিরোধীদের অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা, যুদ্ধবিরোধী দলগুলোর জাতীয় পর্যায়ে অনুপস্থিতি এবং নির্বাচনী পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে